বাড়ন্ত শিশুর সঠিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের ৯০% হয় প্রথম ৫-৬ বছরে, এই কয় বছর বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রতি তাই নিতে হবে এক্সট্রা কেয়ার। আজকে লিখছি শারীরিক বিকাশে পুষ্টিকর খাবার নিয়ে। ৬ মাস বয়স থেকে যখন বুকের দুধের পাশাপাশি কমপ্লিমেন্টারি ফিডিং শুরু হয় তখন থেকেই বাচ্চার খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে।
৬-৯ মাস বয়সে সে খাবার গুলোর সাথে পরিচিত হবে, পছন্দের খাবার বুঝতে শিখবে। ৯ মাসের পর থেকেই যখন মোটামুটি আপনার শিশু সলিড ফুড ভালো করে খেতে পারছে তখন থেকে খুব যত্নের সাথে বাচ্চাদের খাদ্য তালিকায় কিছু নির্দিষ্ট ভিটামিন, প্রোটিন, মিনারেল এড করতে হবে যা শিশুর সঠিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে প্রথম ৬ বছরেই দরকার বিশেষ যত্ন ও বিশেষ খাবার, যা সন্তানকে সঠিক সময়ে দিবে সুষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠার সঠিক পুষ্টি। জেনে নেয়া যাক কি কি খাবার দিতে পারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি।
বাড়ন্ত শিশুদের জন্য যেসব খাবার জরুরিঃ
১. দুধ
শিশুদের পুষ্টির জন্য (বিশেষ করে ২-২.৫ বছর থেকে) দুধ খুব জরুরি একটি খাবার। দুধের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। এই মিনারেলগুলো হাড়, দাঁত ও নখের স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধিতে উপকারী। এছাড়া দুধে আরও রয়েছে প্রোটিন, জিংক, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, আয়োডিন, নায়াসিন ও । এগুলো শিশুর বৃদ্ধির জন্য খুব উপকারী। তাই শিশুকে দৈনিক দুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। তবে দুই বছরের আগে গরুর দুধ না দেয়াই ভালো। দুই বছর পর থেকে সীমিত পর্যায়ে গরুর দুধ খাওয়ানো যাবে। শিশু যদি দুধ পছন্দ না করে, সেক্ষেত্রে দুধের তৈরি অন্যান্য খাবার খাওয়াতে পারেন। যেমন: পুডিং, পায়েশ, কাস্টার্ড, মিল্ক শেক, ইত্যাদি। এগুলো সন্তান আগ্রহ নিয়ে খাবে।
২. ডিম
একটি ডিমে রয়েছে উচ্চ পরিমাণে প্রোটিন। একটি সেদ্ধ ডিমে প্রায় ১২.৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। [সূত্র – উইকিপিডিয়া] আর প্রোটিন শিশুদের জন্য খুবই জরুরি। ডিমের মধ্যে রয়েছে বি ভিটামিন। পাশাপাশি ডিমের মধ্যে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন ডি, ফোলেট, জিংক, আয়রন ও সেলেনিয়াম। এছাড়াও ডিমে মস্তিষ্কের বিকাশের জন্যে রয়েছে কুসুমের পুষ্টি উপাদান কোলিন। যা স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। তাই সকালে একটি ডিম সিদ্ধ দেওয়া যেতে পারে। যা কিনা বাচ্চাদের স্মরণশক্তি বৃদ্ধি ও শারীরিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
৩. মাছ
প্রোটিনের আরেকটি চমৎকার উৎস হচ্ছে মাছ। যেটাতে আছে ভিটামিন বি, মিনারেল, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। [সূত্র – পুষ্টিবার্তা] পাশাপাশি এর বড় সুবিধা হলো এটি লো ফ্যাট। মাছের মধ্যে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ভালো করে এবং বিষণ্ণতা কাটাতে কাজ করে। সামদ্রিক মাছ যেমন স্যামন, টুনা শিশুদের জন্য বেশ ভালো মাছ। এ ছাড়া ছোট ছোট মাছ, যেমন–মলা, ঢেলা ইত্যাদি শিশুর জন্য ভালো।
৪. মিষ্টি আলু
মিষ্টি আলুতে রয়েছে ভরপুর পুষ্টি! এতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার বেটা ক্যারোটিন, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। এই আলু ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফোলেট, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও আঁশের ভালো উৎস। তাছাড়া অনেক বাচ্চারাই এই সবজিটি পছন্দ করে। মিষ্টি আলু সিদ্ধ, গ্রিল কিংবা বেক করে খাওয়ানো যায়। যা শিশুরা খুবই উপভোগ করবে।
৫. দই
দই, বিশেষ করে টক দই শিশুদের জন্য উপকারী। দইয়ে আছে উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হজম ভালো করে। এ ছাড়া নিয়মিত দই খাওয়া হাড় ও দাঁত শক্তিশালী রাখতে কার্যকরি।
৬. তাজা ফল ও ফলের রস
শিশুদের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন আমরা তাজা ফল বা ফলের রস দিতে পারি। জুসের সাথে কিছু বাদামও দিতে পারি। যা শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ করে।
আপনার শিশুর সঠিক ক্যালরি চাহিদা পূরণ করতে নানা রকমের খাদ্য যেমন- শস্য, ফল, সবজি, প্রোটিন, দুগ্ধ ও তেলের মাধ্যমে সুষম বণ্টন করে তাদের খাওয়ানো উচিত। কিন্তু, অনেকেই বুঝতে পারি না প্রতিদিন এই পরিমাণ ক্যালরি কীভাবে নিশ্চিত করব? খুব সহজেই এই কাজটি করতে পারি, এভাবে-
প্রথমে আপনার শিশুর খাবারগুলিকে প্লেটে ভাগ ভাগ করে সাজাতে হবে। প্লেটের আনুমানিক ১/২ ভাগ থাকবে রঙিন শাক-সবজি ও ফলমুল, ১/৪ ভাগ থাকবে ভাত, রুটি, পাউরুটি, সিদ্ধআলু, সিরিয়াল ইত্যাদি কারবোহাইড্রেট এবং ১/৪ ভাগ থাকবে মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ইত্যাদি জাতীয় প্রোটিন। এভাবে আপনার শিশুকে একটি সাজানো প্লেটে করে খাওয়ান, প্রতিদিন পরিবর্তন করে বিভিন্ন আইটেম পরিবেশন করুন।
চেষ্টা করবেন নিজেদের সাথে খাবার খাওয়াতে। এতে করে শিশুর ভেতর এক সাথে খাবার খাওয়া ও সুন্দরভাবে খাবার খাওয়ার নিয়মের অভ্যাস গড়ে উঠবে। এবং পরিবারের সাথে বন্ডিং দঢ় হবে৷ শিশুকে নিজ হাতে খেতে দিন, আমরা অনেকেই আছি শিশুদের নিজ হাতে খেতে দিতে চাই না, খাবার এলোমেলো করে ফেলবে তাই। এটি খুবই ভুল একটি কাজ। বাচ্চার সুন্দর বিকাশের জন্য তার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া অনেক জরুরি। তাই এদিকটি খেয়াল রাখতে হবে।
এই বয়সে খাদ্য অভ্যাস তৈরিতে আমাদের কমন কিছু ভুল নিয়ে ইন শা আল্লাহ আরেকটি পোস্টে আলোচনা করবো।
আজকের এই পোস্টটি পড়ে ইন শা আল্লাহ আমরা বাড়ন্ত বয়সে শিশুর পুষ্টি নিয়ে সচেতন হবো। বাড়ন্ত বয়সে শিশুর সঠিক পুষ্টির অভাবে শারীরিক অনেক সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমনঃ
– সন্তানের শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে
– বুদ্ধির বিকাশ কমে যেতে পারে
– হাড়ের গঠন দুর্বল হতে পারে
– মেজাজ খিটখিতে হয়ে যেতে পারে
– অরুচি ও বদহজম তৈরি হতে পারে
তাই চলুন শিশুর বাড়ন্ত বয়সে দৈনন্দিন খাবারে উপরোক্ত পুষ্টিগুলো নিশ্চিত করি। বাচ্চার সঠিক বৃদ্ধি এবং ডেভেলপমেন্টের ব্যাপারে নিজেও সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি।

